কোষ্ঠকাঠিন্য হলেই অনেকের মনে পড়ে ইসবগুলের ভুসির কথা। পানিতে মিশিয়ে খাওয়া পরিচিত এই খাবারটি দীর্ঘদিন ধরে পেট পরিষ্কার রাখতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে ইসবগুলের উপকারিতা শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে থাকা দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ হজমের পাশাপাশি রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা সহায়তা করতে পারে।
ইসবগুলের ভুসি মূলত উদ্ভিদের বীজের বাইরের আবরণ থেকে তৈরি। এতে প্রচুর পরিমাণে দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ থাকে। পানির সংস্পর্শে এলে এই আঁশ পানি শোষণ করে জেলির মতো পদার্থ তৈরি করে। এতে মল নরম হয় এবং মলত্যাগ সহজ হতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকারী
ইসবগুল পানির সাথে মিশে অন্ত্রে মলের পরিমাণ বাড়াতে এবং মল নরম রাখতে সাহায্য করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমতে পারে। বিভিন্ন গবেষণাতেও কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে ইসবগুলের উপকারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে ইসবগুল খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। পানি কম খেলে পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে অন্ত্রে বাধা তৈরির ঝুঁকিও থাকতে পারে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
ইসবগুলের দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ খাবার হজম ও কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি ধীর করতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ে করা একাধিক গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণেও ইসবগুল গ্রহণের সাথে ফাস্টিং ব্লাড সুগার ও HbA1c কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ইসবগুল কোনোভাবেই ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প নয়।
কমাতে পারে LDL কোলেস্টেরল
ইসবগুলের দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে পিত্ত অ্যাসিডের সাথে যুক্ত হয়ে শরীর থেকে তা বের হতে সাহায্য করতে পারে। এতে শরীরকে নতুন পিত্ত অ্যাসিড তৈরিতে রক্তের কোলেস্টেরল ব্যবহার করতে হয়। ফলে LDL বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা কমতে পারে।
গবেষণায় ইসবগুল গ্রহণের পর LDL কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমার প্রমাণও পাওয়া গেছে। তবে কোলেস্টেরল বেশি থাকলে শুধু ইসবগুলের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ জরুরি।
ক্যানসার প্রতিরোধে কি ইসবগুল কার্যকর?
ইসবগুল নিয়ে ক্যানসার প্রতিরোধের দাবির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত খাদ্যআঁশ অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসবগুল মল দ্রুত বের হতে সহায়তা করায় ক্ষতিকর উপাদানের সাথে অন্ত্রের দেয়ালের সংস্পর্শের সময় কমতে পারে। পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাদ্য হিসেবে কাজ করা এবং শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরিতে সহায়তা করার মতো সম্ভাব্য উপকার নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে এসব সম্ভাব্য প্রক্রিয়া থেকে সরাসরি বলা যায় না যে ইসবগুল খেলেই ক্যানসার প্রতিরোধ হবে। ইসবগুলকে ক্যানসারের প্রতিরোধক ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়।
প্রতিদিন ইসবগুল খাওয়া কি নিরাপদ?
বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের জন্য উপযুক্ত পরিমাণে ইসবগুল সাধারণত নিরাপদ। তবে শুরুতেই বেশি পরিমাণে খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের গিলতে সমস্যা আছে, অন্ত্রে কোনো বাধা রয়েছে বা গুরুতর পেটের সমস্যা আছে, তাদের ইসবগুল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিয়মিত ওষুধ সেবন করলেও চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সাথে পরামর্শ করা ভালো। কারণ খাদ্যআঁশ কিছু ওষুধের শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে।
কীভাবে খাবেন?
ইসবগুল সাধারণত পানি বা অন্য কোনো তরলে মিশিয়ে খাওয়া হয়। তরলে মেশানোর পর বেশি সময় অপেক্ষা না করে খেয়ে নেওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা ভালো।
তবে কতটা ইসবগুল খেতে হবে, তা ব্যক্তির বয়স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা ও ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
শুধু ইসবগুলেই কি ফাইবারের চাহিদা পূরণ হবে?
শুধু ইসবগুলের ওপর নির্ভর করে দৈনিক খাদ্যআঁশের চাহিদা পূরণ করা উচিত নয়। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে খাদ্যআঁশ গ্রহণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজন অনুযায়ী ইসবগুল অতিরিক্ত ফাইবারের উৎস হিসেবে কাজে আসতে পারে। তবে এটি কখনোই সুষম খাবারের বিকল্প নয়।
ইসবগুল তাই শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ঘরোয়া উপায় নয়। এর দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ হজমের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, মলত্যাগ সহজ করতে এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা ও LDL কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে এটিকে কোনো রোগের ওষুধ বা ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ইসবগুল খেলে পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
Mytv Online